ফ্ল্যাট কিনলেন, কিন্তু একদিন ছাদে গিয়ে দেখলেন সেখানে ডেভেলপারের বসানো বিজ্ঞাপনের বোর্ড, বা পানির ট্যাংকের জায়গাটা অন্য একজন ফ্ল্যাট মালিকের একার দখলে। দলিল খুলে খুঁজলেন, কমন এরিয়ার কথা আছে ঠিকই, কিন্তু কোনটা কার সেটা স্পষ্ট নয়। ফ্ল্যাটের কমন এরিয়া আসলে কার মালিকানায় থাকে, আইন কী বলে, আর কেনার আগে কোন কাগজে কী দেখতে হয়, এই লেখায় সেটাই সহজ করে বলা হলো।
বাংলাদেশে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ধারা ২-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী কমন স্পেস মানে রিয়েল এস্টেটের জন্য সহযোগী স্পেস, যেমন লিফট-লবি, সিঁড়িঘর, লিফট মেশিন রুম, জেনারেটর সাব-স্টেশন, কেয়ারটেকার কক্ষ, গার্ড রুম, এবং কমন ফ্যাসিলিটিজের জন্য ব্যবহৃত স্থান।
এই সংজ্ঞায় “ছাদ” শব্দটা আলাদাভাবে উল্লেখ নেই। ছাদ নিয়ে বিরোধের একটা বড় কারণ আসলে এখানেই লুকিয়ে থাকে।
একই আইনে “বিল্ডিং সার্ভিসেস” নামে আরেকটা সংজ্ঞা আছে, যার মধ্যে লিফট, গ্যারেজ, পানি সরবরাহ, অগ্নিনির্বাপণ, গ্যাস সরবরাহের মতো সুবিধা পড়ে। কমন স্পেস আর বিল্ডিং সার্ভিসেস দুটো আলাদা ধারণা হলেও ব্যবহারিক অর্থে একসঙ্গেই কাজ করে, একটা জায়গা বোঝায় আর অন্যটা সেই জায়গায় থাকা সুবিধা।
কমন এরিয়া কোনো একজন ফ্ল্যাট মালিকের একার সম্পত্তি নয়, আবার এটা ডেভেলপারেরও একার সম্পত্তি থেকে যায় না হস্তান্তরের পর। প্রতিটা ফ্ল্যাটের সঙ্গে কমন এরিয়ায় একটা অনুপাতিক অবিভাজ্য অংশ, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় undivided share, যুক্ত থাকে।
ধরুন একটা ভবনে দশটা ফ্ল্যাট, প্রতিটার আয়তন সমান। সেক্ষেত্রে প্রতিটা ফ্ল্যাটের সঙ্গে কমন এরিয়ার দশ ভাগের এক ভাগ অংশ যুক্ত থাকবে, এই অংশটাই আনডিভাইডেড শেয়ার। ফ্ল্যাটের আয়তন যত বেশি, শেয়ারও সাধারণত তত বেশি হয়। এই শেয়ার আলাদা করে ভাগ করে নেওয়া যায় না, আপনি “আমার ভাগের লিফট” আলাদা করে দাবি করতে পারবেন না, বরং পুরো কমন এরিয়ায় আপনার একটা অনুপাতিক অংশীদারত্ব থাকে।
সাফ-কবলা দলিলে ফ্ল্যাটের বর্ণনার পাশাপাশি একটা অনুচ্ছেদ থাকে যেখানে কমন এরিয়ার তালিকা এবং তাতে আপনার অনুপাতিক শেয়ার উল্লেখ থাকে। এই অনুচ্ছেদটা অনেক ক্রেতাই মন দিয়ে পড়েন না, অথচ পরে বিরোধ হলে এই একটা লাইনই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে।
আইনের সংজ্ঞায় ছাদের কথা আলাদাভাবে না থাকার সুযোগ নিয়ে কিছু ডেভেলপার ছাদকে নিজেদের সম্পত্তি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন। বাস্তবে সাধারণ প্রথা অনুযায়ী ছাদ কমন এরিয়ার অংশ হিসেবেই গণ্য হয়, সব ফ্ল্যাট মালিকের যৌথ ব্যবহারের অধিকার থাকে।
মোবাইল অপারেটরের টাওয়ার বসানো, বিজ্ঞাপনের বোর্ড ভাড়া দেওয়া, বা আলাদা পেন্টহাউস-সুবিধা তৈরি করে বিক্রি করা, এই তিনটাই ছাদ থেকে বাড়তি আয়ের সাধারণ উপায়। ভবন হস্তান্তরের আগেই এই আয়ের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে ফেললে পরে মালিক সমিতির আপত্তি করার জায়গা কমে যায়।
বায়নানামা বা সাফ-কবলায় একটা বাক্য থাকা উচিত যে ছাদ কমন এরিয়ার অন্তর্ভুক্ত এবং এর ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত মালিক সমিতির অনুমোদন সাপেক্ষে হবে। ডেভেলপার যদি ছাদের কোনো অংশ নিজের জন্য আলাদা রাখতে চান, যেমন ওয়াটার ট্যাংক বা জেনারেটরের জায়গা, সেটা চুক্তিতে স্পষ্টভাবে লেখা থাকা উচিত, মৌখিক প্রতিশ্রুতি নয়।
লিফট আর সিঁড়ি নিয়ে বিরোধ কম হয়, কারণ এগুলোর ব্যবহার প্রতিদিনের এবং সবাই সমানভাবে ব্যবহার করেন। তবে লিফটের চলাচলের সময়সূচি, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কীভাবে ভাগ হবে, এসব সাধারণত ভবন হস্তান্তরের পর গঠিত মালিক সমিতির নীতিমালায় নির্ধারিত হয়। ফ্ল্যাট কেনার সময় ডেভেলপারের কাছে জিজ্ঞেস করে নিতে পারেন এই নীতিমালার একটা খসড়া বা নমুনা আছে কি না।
জেনারেটর সাব-স্টেশন, পানির পাম্প রুম, কেয়ারটেকার ও গার্ডের কক্ষ, এগুলোও আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী কমন স্পেসের অংশ। পার্কিং নিয়ে আলাদা জটিলতা আছে, কারণ কার পার্কিং কিছু প্রকল্পে কমন এরিয়ার অংশ, আবার কিছু প্রকল্পে আলাদা দামে বিক্রি হওয়া নির্দিষ্ট মালিকানার সম্পত্তি। পার্কিং নিয়ে কী কী যাচাই করা দরকার তার বিস্তারিত আলোচনা আছে ফ্ল্যাট কেনার আগে পার্কিং স্পেস যাচাই লেখায়।
| যা দেখবেন | কোথায় পাবেন | কী বোঝা যায় |
|---|---|---|
| কমন এরিয়ার তালিকা | সাফ-কবলা দলিল | কোন কোন জায়গা কমন হিসেবে ধরা হয়েছে |
| আনডিভাইডেড শেয়ারের অনুপাত | দলিলের নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ | আপনার ফ্ল্যাটের সঙ্গে কতটুকু শেয়ার যুক্ত |
| ছাদ সংক্রান্ত শর্ত | চুক্তি ও দলিল | ছাদ কমন কি না, ডেভেলপার কোনো অংশ রাখছেন কি না |
| জেনারেটর ও ইউটিলিটি রুম | নকশা ও দলিল | এসব জায়গা আলাদা করে বিক্রয়যোগ্য কি না |
দলিলে কমন এরিয়া নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলে সেটা রেজিস্ট্রেশনের আগেই সংশোধন করিয়ে নেওয়া উচিত। রেজিস্ট্রেশনের পর সংশোধন অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ এবং খরচসাপেক্ষ হয়ে যায়। ফ্ল্যাট কেনার সময় সামগ্রিকভাবে কোন কোন কাগজ দেখে নেওয়া দরকার তার তালিকা আছে ফ্ল্যাট কেনার নিয়ম কানুন লেখায়।
ভবন হস্তান্তরের পর ডেভেলপারের দায়িত্ব মূলত শেষ হয়ে যায়, কমন এরিয়ার দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যায় ফ্ল্যাট মালিকদের নিয়ে গঠিত সমিতির হাতে। এই সমিতি একটা নীতিমালা তৈরি করে, যেখানে লিফট ব্যবহারের নিয়ম, সার্ভিস চার্জের হিসাব, ছাদ ব্যবহারের শর্ত, সবকিছু লেখা থাকে। সমিতি গঠনের আগেই কোনো ফ্ল্যাট মালিক যদি একটা নির্দিষ্ট জায়গা নিজের জন্য দখল করে নেন, সেটাও পরে বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ফ্ল্যাট নামজারি ও হস্তান্তরের সময় কমন এরিয়া-সংক্রান্ত কাগজপত্র কীভাবে জমা দিতে হয়, তার বিস্তারিত আছে ফ্ল্যাট নামজারি করতে কী কী লাগে লেখায়।
রিয়েল এস্টেট আইন অনুযায়ী ডেভেলপারের বিরুদ্ধে ক্রেতারা সরাসরি আদালতে মামলা করতে পারেন না, প্রথমে যেতে হয় সালিসী ট্রাইব্যুনালে। এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে, তাই সবচেয়ে ভালো প্রতিকার হলো কেনার আগেই দলিলে কমন এরিয়ার বর্ণনা স্পষ্টভাবে লিখিয়ে নেওয়া। বিরোধ জটিল মনে হলে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত, বিশেষ করে ছাদ বা কমন এরিয়া সংক্রান্ত অস্পষ্টতার ক্ষেত্রে।
| যাচাইয়ের বিষয় | কোথায় দেখবেন | না মিললে করণীয় |
|---|---|---|
| কমন এরিয়ার তালিকা দলিলে আছে কি না | সাফ-কবলার খসড়া | তালিকা যোগ করিয়ে নিন |
| আনডিভাইডেড শেয়ারের অনুপাত উল্লেখ আছে কি না | দলিল | নির্দিষ্ট সংখ্যা চান |
| ছাদ কমন এরিয়ার অংশ কি না | চুক্তি | স্পষ্ট বাক্য যোগ করান |
| মালিক সমিতির নীতিমালার খসড়া আছে কি না | ডেভেলপার | নমুনা চেয়ে নিন |
ছাদ কি ফ্ল্যাট মালিকদের সবার, নাকি ডেভেলপারের?
আইনের সংজ্ঞায় ছাদের কথা আলাদাভাবে না থাকলেও সাধারণ প্রথা অনুযায়ী ছাদ কমন এরিয়ার অংশ, সব ফ্ল্যাট মালিকের যৌথ ব্যবহারের অধিকার থাকে। চুক্তিতে এটা স্পষ্ট করে লিখিয়ে নেওয়া নিরাপদ।
আনডিভাইডেড শেয়ার কীভাবে হিসাব হয়?
সাধারণত ফ্ল্যাটের আয়তনের অনুপাতে হিসাব করা হয়। প্রতিটা ফ্ল্যাটের সঙ্গে কমন এরিয়ায় একটা অনুপাতিক অবিভাজ্য অংশ যুক্ত থাকে, যা দলিলে উল্লেখ থাকা উচিত।
লিফট ও জেনারেটরের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কে বহন করে?
সাধারণত সব ফ্ল্যাট মালিক মিলে সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে এই খরচ বহন করেন। ভাগের হিসাব মালিক সমিতির নীতিমালায় নির্ধারিত হয়।
কমন এরিয়া নিয়ে বিরোধ হলে কোথায় যেতে হবে?
রিয়েল এস্টেট আইন অনুযায়ী প্রথমে সালিসী ট্রাইব্যুনালে যেতে হয়, সরাসরি আদালতে মামলা করার সুযোগ সীমিত।
ডেভেলপার ছাদে বিজ্ঞাপনের বোর্ড বসাতে পারেন কি?
ছাদ কমন এরিয়ার অংশ হলে এককভাবে ডেভেলপারের এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা নয়। চুক্তিতে এমন কোনো শর্ত না থাকলে মালিক সমিতির অনুমোদন ছাড়া এটা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।