মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর থেকে উত্তরার ফ্ল্যাট বাজারটা আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। যাদের অফিস মতিঝিলে বা ফার্মগেটে, তাদের অনেকেই এখন উত্তরায় থাকার কথা ভাবছেন। কারণটা সহজ। উত্তরা থেকে ফার্মগেটের মেট্রো ভাড়া মাত্র ৭০ টাকা, মতিঝিল পর্যন্ত ১০০ টাকা। সোর্সঃ The Daily Star Bangla ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকার চেয়ে এটা অনেক বেশি সহনীয়।
কিন্তু এই সুবিধার একটা সরাসরি প্রভাব পড়েছে ফ্ল্যাটের দামে। স্টেশনের কাছের এলাকাগুলোতে চাহিদা বাড়ছে, দামও বাড়ছে। তাহলে আসলে কতটা বেড়েছে? আর কেনাটা কি সত্যিই বুদ্ধিমানের কাজ হবে?
Contents
উত্তরায় মেট্রোরেলের তিনটা স্টেশন আছে। উত্তরা নর্থ, উত্তরা সেন্টার আর উত্তরা সাউথ। এই তিনটা স্টেশন পুরো উত্তরাকে মোটামুটি ঢেকে ফেলেছে।
উত্তরা নর্থ স্টেশন থেকে আজমপুর, হাউজ বিল্ডিং, আব্দুল্লাহপুর এলাকায় সহজে যাওয়া যায়। Dhaka MetroRail এই স্টেশনটা মূলত উত্তরার উত্তর প্রান্তের মানুষদের কাজে আসে। উত্তরা সেন্টার স্টেশন থেকে সেক্টর ১৫, ১৬, ১৮ এবং পঞ্চবটি এলাকায় যাওয়া যায়।
“কাছাকাছি” বলতে এখানে হাঁটার দূরত্ব বোঝানো হচ্ছে। মানে পায়ে হেঁটে ৫ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে স্টেশনে পৌঁছানো যায় এমন এলাকা। সেক্টর ৩, ৬, ৭, ১১, ১৩ মোটামুটি এই দূরত্বের মধ্যে পড়ে।
সরাসরি বলতে গেলে, মেট্রো স্টেশনের আশেপাশে কোটি টাকার নিচে ভালো ফ্ল্যাট পাওয়া এখন বেশ কঠিন।
এক কোটি টাকা হাতে নিয়ে আবাসন মেলায় আসা অবসরপ্রাপ্ত একজন ব্যাংকার ১,৩৫০ বর্গফুটের তিন বেডরুমের ফ্ল্যাট খুঁজছিলেন উত্তরায়। কিন্তু পছন্দ অনুসারে কোনো ফ্ল্যাট পাননি। The Business Standard এটা শুধু একজনের গল্প না, এটাই এখন উত্তরার বাজারের বাস্তবতা।
পুরনো ফ্ল্যাট বা সেকেন্ড হ্যান্ড বাজার
উত্তরায় ফ্ল্যাটের দাম প্রতি বর্গফুটে প্রায় ৯,০০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ১৬,০০০ টাকা পর্যন্ত যায়। GLG Assets Ltd স্টেশন থেকে যত কাছে, দাম তত বেশি। সেক্টর ৩ বা ৭ এর মতো মিডিল অবস্থানে পুরনো ফ্ল্যাটও এখন ৯,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকা প্রতি বর্গফুটে বিক্রি হচ্ছে।
৮০০ বর্গফুটের একটা দুই বেডরুমের ফ্ল্যাটের কথা হিসাব করলে দাঁড়ায় ৭২ লাখ থেকে ৯৬ লাখের মধ্যে। ১,২০০ বর্গফুটের তিন বেডরুম হলে কোটি টাকার উপরে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত।
নতুন প্রজেক্টের দাম
নতুন প্রজেক্টে দাম আরেকটু বেশি। নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়া আর নতুন ড্যাপ নীতির কারণে মাত্র এক বছরে ফ্ল্যাটের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। ডেভেলপাররা এই বাড়তি খরচ স্বাভাবিকভাবেই ক্রেতার কাছে চাপিয়ে দিচ্ছেন।
দূরে গেলে কতটা সাশ্রয়
উত্তরার বাইরের সেক্টর বা দিয়াবাড়িতে গেলে দাম নামে। মূল উত্তরার তুলনায় দিয়াবাড়িতে ফ্ল্যাটের দাম অনেক কম, তবে সুবিধা প্রায় একই কারণ মেট্রোরেলের সংযোগ আছে। যারা একটু কম দামে কিনতে চান, তারা দিয়াবাড়ি বা উত্তরার প্রান্তের সেক্টরগুলো দেখতে পারেন।
মেট্রো আসার আগে উত্তরায় মূলত সেই মানুষেরাই থাকতেন যারা উত্তরা বা আশেপাশের এলাকায় কাজ করতেন। দূরত্বটা একটা বড় বাধা ছিল।
এখন সেটা আর নেই। মেট্রোরেল চাহিদা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে, এবং চাহিদার কারণে নতুন আবাসন প্রজেক্টও আসছে। ক্রেতার প্রোফাইলও বদলে গেছে। আগে যারা শুধু থাকার জন্য কিনতেন, এখন তাদের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরাও আসছেন। কারণটা পরিষ্কার। মেট্রোরেল স্টেশনের কাছাকাছি এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া পাওয়ার সুযোগ বেশি।
ভাড়ার বাজারেও প্রভাব পড়েছে। স্টেশনের কাছের এলাকায় ১,০০০ বর্গফুটের একটা ফ্ল্যাটের ভাড়া এখন ২৫,০০০ থেকে ৩৫,০০০ টাকার মধ্যে চলছে, এলাকা আর বিল্ডিং ভেদে। যারা বাইরে থেকে ঢাকায় এসে কাজ করেন এবং নিজের পরিবার নিয়ে থাকতে চান, তারাই এখন স্টেশনের কাছের ভাড়ার ফ্ল্যাটগুলো নিচ্ছেন। GLG Assets Ltd
এতক্ষণ যা বললাম সেটার একটা উল্টো দিকও আছে।
দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ৬০ লাখ টাকা বাজেট নিয়ে যারা উত্তরায় ফ্ল্যাট খুঁজছেন, তাদের জন্য খুব বেশি অপশন নেই। স্টেশনের আশেপাশে নতুন ধরনের সমস্যাও তৈরি হয়েছে। ভিড় বেড়েছে, পার্কিংয়ের জায়গা কমে গেছে, হকার বেড়েছে।
পুরনো বিল্ডিংয়ে সমস্যা আলাদা। মেট্রো চালু হওয়ার পর অনেক বাড়ির মালিক ফ্ল্যাটের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন, কিন্তু বিল্ডিংয়ের মান সেই তুলনায় ওঠেনি। পুরনো বিল্ডিং দেখে দাম বেশি মনে হলে একটু সতর্ক থাকা ভালো।
ডেভেলপারদের নতুন প্রজেক্টে বিলম্বের সমস্যাও আছে। এটা নতুন কিছু না, তবে যারা একটা নির্দিষ্ট সময়ে ফ্ল্যাটে উঠতে চান তাদের জন্য এটা বিরক্তির বিষয়।
বিনিয়োগের দৃষ্টিতে দেখলে উত্তরায় এখন কেনার পক্ষে যুক্তি আছে। মেট্রোরেল সুবিধার কারণে উত্তরার মতো এলাকায় ভবিষ্যতে দাম আরো বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যত দিন যাবে, দাম তত বাড়বে। এখন যে দামে কেনার সুযোগ আছে, দুই বছর পরে সেটা নাও থাকতে পারে।
কিন্তু থাকার জন্য কিনলে হিসাবটা একটু আলাদা করে করতে হবে। যদি ব্যাংক লোন নিতে হয়, তাহলে মাসিক কিস্তি আর ভাড়ার তুলনাটা একবার কষে দেখুন। অনেক সময় দেখা যায়, ভাড়ায় থাকলে মাসে যা খরচ হয়, লোনের কিস্তি তার চেয়ে বেশি পড়ে। তখন কেনার সিদ্ধান্তটা আসলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত, থাকার সিদ্ধান্ত না।
যারা এখনই কিনতে পারবেন না, তাদের জন্য ভাড়ার বাজারে উত্তরায় অপশন আছে। স্টেশনের একটু দূরে সরে গেলে ভালো ফ্ল্যাট কম ভাড়ায় পাওয়া যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে মেট্রোর সুবিধাটা তেমন একটা কমে না।
কাগজপত্র দেখা বাদ দিয়ে শুধু দাম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক না। জমির দলিল, বিল্ডিং প্ল্যান, রাজউকের অনুমোদন এগুলো যাচাই করতেই হবে।
স্টেশন থেকে দূরত্বটা নিজে গিয়ে একবার মেপে দেখুন। গুগল ম্যাপে যা দেখায় আর বাস্তবে হাঁটতে গিয়ে যা লাগে, সেটা প্রায়ই আলাদা হয়। দুপুরে একবার হাঁটুন, সন্ধ্যায় একবার হাঁটুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন।
ডেভেলপারের আগের প্রজেক্টের ইতিহাস যাচাই করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো আইনি বা মানগত সমস্যায় পড়তে না হয়।
ব্যাংক লোন নেবেন কিনা সেটা আগেই ঠিক করুন। কোন ব্যাংক কত সুদে দিচ্ছে, প্রি-অ্যাপ্রুভাল পাওয়া যাচ্ছে কিনা, এগুলো আগে থেকে জেনে রাখলে দাম নিয়ে আলোচনার সময় শক্ত অবস্থানে থাকা যায়।
মেট্রো এসেছে, বাজার বদলেছে। এটা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু সব সেক্টরে, সব দামে পরিবর্তন একরকম না। কিছু জায়গায় দাম বেড়েছে অনেকটা, কিছু জায়গায় এখনো সুযোগ আছে। সেটা খুঁজে বের করতে হলে একটু সময় দিতে হবে, একাধিক জায়গা দেখতে হবে, আর কয়েকজন স্থানীয় এজেন্টের সাথে কথা বলতে হবে।
এই লেখা পড়ে কেনার সিদ্ধান্ত না নিলেও চলবে। কিন্তু অন্তত জানলেন কী কী প্রশ্ন করতে হবে, কোন বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। ফ্ল্যাট কেনা বড় সিদ্ধান্ত, তাড়াহুড়া করে নেওয়ার কিছু নেই।