একজন ক্লায়েন্ট একবার অফিসে এসে বসলেন, মুখটা কেমন থমথমে। বললেন, “একজন লোককে অগ্রিম দিয়েছিলাম ফ্ল্যাট দেখানোর কথা বলে, এরপর নম্বর বন্ধ। ফোনটাও ধরে না।” এই ধরনের গল্প নতুন কিছু না। বাংলাদেশে এজেন্ট বা দালালের হাতে ঠকে যাওয়ার ঘটনা এত বেশি যে অনেকে এখন সরাসরি “এজেন্ট” শব্দটা শুনলেই সন্দেহ করেন।
অথচ ভালো এজেন্ট থাকলে পুরো প্রক্রিয়াটাই সহজ হয়ে যায়। সমস্যাটা এজেন্ট রাখা না রাখায় না, সমস্যাটা কাকে বিশ্বাস করছেন সেখানে। আজকের লেখায় বলব কীভাবে একজন নির্ভরযোগ্য এজেন্ট চিনবেন, আর কোন লক্ষণ দেখলে সরে আসা উচিত।
নির্ভরযোগ্য এজেন্ট চেনার সহজ পথ হলো, তার আগের কাজের প্রমাণ চাওয়া, কমিশনের হিসাব শুরুতেই লিখিতভাবে ঠিক করা, আর কোনো টাকা দেওয়ার আগে সম্পত্তির দলিল নিজে বা আইনজীবী দিয়ে যাচাই করে নেওয়া। এই তিনটা ধাপ মেনে চললে বড় প্রতারণার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
এই প্রশ্নটা প্রায়ই শুনি। বাংলাদেশে “দালাল” শব্দটার সাথে একটা নেতিবাচক ভাব জড়িয়ে গেছে, অথচ পেশাটা খারাপ না। যিনি ক্রেতা আর বিক্রেতার মধ্যে সংযোগ করিয়ে দেন, তথ্য দেন, দর কষাকষিতে সাহায্য করেন, তিনিই এজেন্ট। সমস্যাটা তৈরি হয় যখন কেউ নিজেকে এজেন্ট পরিচয় দিয়ে আসলে কোনো দায়বদ্ধতা ছাড়াই কাজ করে, কোনো অফিস নেই, ঠিকানা নেই, শুধু একটা মোবাইল নম্বর।
তাই প্রথম পার্থক্যটা এখানেই করে নিন। যিনি কোনো প্রতিষ্ঠিত এজেন্সি বা অফিসের সাথে যুক্ত, যার একটা ঠিকানা আছে, তিনি একরকম। আর যিনি শুধু পরিচিতের মাধ্যমে এসে “আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারি” বলছেন, তিনি ভিন্ন।
দ্বিতীয় ধরনের মানুষ পুরোপুরি খারাপ, এমনটাও বলছি না। অনেক ভালো, সৎ মানুষও এভাবে অনানুষ্ঠানিকভাবে এই কাজ করেন, পরিচিতদের সাহায্য করতে গিয়েই একসময় এটা পেশা হয়ে ওঠে। তবে ঝুঁকিটা বেশি, কারণ কিছু ভুল হলে জবাবদিহি করার কেউ থাকে না। অফিস নেই মানে অভিযোগ জানানোর জায়গাও নেই।
আরেকটা ব্যাপার খেয়াল রাখা ভালো, ঢাকার মতো শহরে অনেক এজেন্ট একইসাথে একাধিক প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করেন, এতে খারাপ কিছু নেই। কিন্তু জিজ্ঞেস করে নেওয়া ভালো, তিনি কোন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এই সম্পত্তিটা দেখাচ্ছেন, নাকি নিজের ব্যক্তিগত পরিচিতির মাধ্যমে। উত্তরটা যদি ঘোরানো মনে হয়, সেটাও একধরনের সংকেত।
প্রথমেই দেখুন তার হাতে থাকা তালিকায় কী কী সম্পত্তি আছে, আর সেগুলো নিয়ে জিজ্ঞেস করলে স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেন কিনা। প্রকৃত এজেন্ট সাধারণত সম্পত্তির মালিকানা, দাম, এলাকার প্রেক্ষাপট নিয়ে গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। যিনি প্রতিটা প্রশ্নে ঘুরিয়ে উত্তর দেন বা চাপ দিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বলেন, তার থেকে সাবধান থাকা ভালো।
আগের ক্লায়েন্টদের রেফারেন্স চাইতে দ্বিধা করবেন না। ভালো এজেন্ট এতে বিরক্ত হন না, বরং সহজেই দুয়েকটা নাম দিয়ে দেন। যিনি রেফারেন্স দিতে গড়িমসি করেন, ধরে নিতে পারেন তার কাজের ইতিহাসটা খুব একটা পরিষ্কার না।
কমিশনের হিসাবটা শুরুতেই খোলাসা করে নিন। ঢাকায় সাধারণত ভাড়ার ক্ষেত্রে এক মাসের ভাড়ার সমান কমিশন, আর কেনাবেচার ক্ষেত্রে মোট দামের প্রায় এক শতাংশের আশেপাশে ধরা হয়। কেউ যদি এর চেয়ে অনেক বেশি চান, বা কমিশনের কথা এড়িয়ে যান, সেটাও একটা সংকেত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, ভালো এজেন্ট নিজে থেকেই দলিল যাচাইয়ের কথা বলেন। “স্যার, আমি তো শুধু দেখাচ্ছি, বাকিটা আপনি আইনজীবী দিয়ে যাচাই করে নেবেন” এই কথাটা যিনি নিজে থেকেই বলেন, তার সততা নিয়ে সংশয় কম থাকে।
উল্টো যিনি বলেন “আরে এসব লাগবে না, আমি তো আছি”, তাকে নিয়ে বরং সতর্ক হওয়া উচিত। ডেভেলপারের সুনাম যাচাইয়ের ধাপগুলো নিয়ে আমরা আগে বিস্তারিত লিখেছি বিল্ডারের সুনাম যাচাইয়ের ৫টি উপায় লেখায়, এজেন্টের তথ্যের সাথে সেই যাচাইটাও মিলিয়ে নিতে পারেন।
একবার একজন ক্লায়েন্ট বলেছিলেন, তিনি এজেন্ট বাছাই করার সময় একটা ছোট্ট পরীক্ষা করেন। ইচ্ছে করে একটা প্রশ্ন করেন যার উত্তর সহজে জানা যায় না, যেমন এলাকার পুরনো কোনো বিরোধ বা সমস্যা নিয়ে।
যিনি সৎভাবে বলেন “এটা আমার জানা নেই, খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি”, তাকেই তিনি বেশি বিশ্বাস করেন। যিনি সবকিছুর উত্তর তাৎক্ষণিক দিয়ে দেন, তার কথায় একটু সন্দেহ রাখাই ভালো। পদ্ধতিটা হয়তো সবার জন্য প্রযোজ্য না, কিন্তু ধারণাটা কাজের, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী উত্তর সবসময় নির্ভরযোগ্যতার লক্ষণ না।
প্রথম প্রশ্ন, তিনি কতদিন ধরে এই কাজে আছেন, আর কোন এলাকায় বেশি কাজ করেন। যিনি নির্দিষ্ট একটা এলাকায় নিয়মিত কাজ করেন, তার হাতে সাধারণত স্থানীয় তথ্য বেশি থাকে, দাম সম্পর্কে ধারণাও নির্ভরযোগ্য হয়।
দ্বিতীয় প্রশ্ন, এই সম্পত্তির মালিক কে, আর দলিল সরাসরি দেখা যাবে কিনা। কেউ যদি বলেন “মালিক এখন দেশে নেই, দলিল পরে দেখাবো”, সেটা মিথ্যা নাও হতে পারে, কিন্তু সেক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকা দরকার।
তৃতীয় প্রশ্ন, তার কমিশন ঠিক কবে আর কীভাবে পরিশোধ করতে হবে। মৌখিক কথায় ভরসা না করে এই অংশটা লিখে রাখলে পরে ঝামেলা কম হয়।
কেউ যদি বলে টাকা আগে দিতে হবে, তারপর ফ্ল্যাট দেখাবে, তাহলে বুঝে নিন কিছু একটা ঠিক নেই। বৈধ এজেন্ট সাধারণত সম্পত্তি দেখানোর আগে টাকা চান না।
একই সম্পত্তি নিয়ে যদি একাধিক এজেন্ট আলাদা আলাদা দাম বলেন, বা দলিলের তথ্য অসামঞ্জস্যপূর্ণ শোনায়, সেখানেও থেমে যাওয়া উচিত।
আর যদি এজেন্ট বারবার তাড়া দেন, “আজকেই সিদ্ধান্ত না নিলে সুযোগ হাতছাড়া হবে” এই ধরনের কথা বলে, সেটা প্রায় সবসময়ই একটা চাপ তৈরির কৌশল। ভালো সম্পত্তি একদিনে হারিয়ে যায় না, আর প্রকৃত এজেন্ট এই ধরনের চাপ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেন না।
নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে অনেক সময় সরাসরি ডেভেলপারের সাথে কথা বলাই সহজ, কারণ সেখানে মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন কম থাকে, দলিলও ডেভেলপারের হাতে গোছানো থাকে।
কিন্তু পুরনো ফ্ল্যাট বা রিসেল সম্পত্তির ক্ষেত্রে একজন ভালো এজেন্ট আসলে অনেক সময় বাঁচিয়ে দেন, কারণ তার হাতে একসাথে অনেকগুলো বিকল্প থাকে, আর এলাকার বাজারদর সম্পর্কে ধারণাও থাকে।
আমার পরামর্শ, দুটোই মিলিয়ে ব্যবহার করুন। নতুন প্রকল্পের খোঁজে ডেভেলপারের সাথে সরাসরি কথা বলুন, রিসেল বা পুরনো ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে একজন যাচাই করা এজেন্টের সাহায্য নিন। কোনটা কখন কাজে লাগবে সেটা নির্ভর করে আপনি ঠিক কী খুঁজছেন তার উপর।
খুব নির্দিষ্ট এলাকা বা বাজেটের মধ্যে কিছু খুঁজলে এজেন্ট দ্রুত কাজে লাগে, কারণ তার হাতে একসাথে অনেক বিকল্প থাকে। কিন্তু কোনো একটা নির্দিষ্ট প্রকল্প নিয়ে সিদ্ধান্ত প্রায় ঠিক করে ফেলেছেন, শুধু বিস্তারিত জানতে চান, সেক্ষেত্রে ডেভেলপারের সাথে সরাসরি কথা বলাটাই বেশি কার্যকর, কারণ তথ্যটা একেবারে উৎস থেকে আসছে।
এজেন্ট যত ভালোই হোন, শেষ পর্যন্ত দলিল যাচাইয়ের দায়িত্বটা নিজের। জমির মালিকানার তথ্য এখন সরকারি ভূমি তথ্য সেবা পোর্টালে অনেকটাই অনলাইনে যাচাই করা যায়, এটা নিয়ে আমরা আগে বিস্তারিত লিখেছি জমির দলিল অনলাইনে যাচাইয়ের পদ্ধতি পোস্টে। ভবনটা RAJUK অনুমোদিত কিনা সেটাও নিজে যাচাই করা সহজ, কীভাবে করবেন তা নিয়ে লিখেছি RAJUK অনুমোদিত বনাম অননুমোদিত ফ্ল্যাট লেখায়।
ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্ভরযোগ্য কিনা, সেটার একটা পূর্ণাঙ্গ চেকলিস্ট আমরা আগে দিয়েছিলাম সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ভালো রিয়েল এস্টেট কোম্পানি চেনার উপায় পোস্টে। আইনজীবী ছাড়াই নিজে নিজে দলিল যাচাইয়ের পুরো পদ্ধতিটা নিয়ে লিখেছি আইনজীবী ছাড়া সম্পত্তির দলিল যাচাইয়ের নিয়ম পোস্টে। এজেন্ট আর ডেভেলপার দুটোই যাচাই করে নিলে ঝুঁকি প্রায় শূন্যে নেমে আসে।
REHAB এর ওয়েবসাইটেও নিবন্ধিত ডেভেলপার আর তাদের প্রকল্পের তথ্য পাওয়া যায়, এজেন্ট যে সম্পত্তির কথা বলছেন সেটার ডেভেলপার সেখানে তালিকাভুক্ত কিনা দেখে নেওয়াও একটা ভালো অভ্যাস।
একজন খারাপ এজেন্টের গল্প শুনে পুরো পেশাটাকেই সন্দেহের চোখে দেখাটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, কিন্তু ভালো এজেন্ট আসলে অনেক সময় আর ঝামেলা বাঁচিয়ে দেন। মূল কথা হলো, যাচাই না করে বিশ্বাস করবেন না। রেফারেন্স চান, কমিশন লিখে রাখুন, দলিল নিজে দেখুন বা আইনজীবী দিয়ে দেখান। এই অভ্যাসগুলো একটু সময়সাপেক্ষ মনে হতে পারে, কিন্তু পরে বড় কোনো ক্ষতি থেকে বাঁচায়।
কোনো নির্দিষ্ট সম্পত্তি নিয়ে দ্বিধায় আছেন, বা এজেন্টের কথায় নিশ্চিত হতে পারছেন না? আমাদের চলমান প্রকল্পগুলো দেখতে পারেন, অথবা সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন। ডেভেলপারের সাথে সরাসরি কথা বললে অনেক সময় মাঝখানের অনিশ্চয়তাটাই আর থাকে না।
ভাড়ার ক্ষেত্রে সাধারণত এক মাসের ভাড়ার সমান, বিক্রির ক্ষেত্রে মোট দামের প্রায় এক শতাংশের কাছাকাছি। এলাকা ও এজেন্সিভেদে এটা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরে, দলিল যাচাই শেষে। সম্পত্তি দেখানোর আগে বা দেখার পরপরই টাকা চাওয়া হলে সতর্ক হওয়া উচিত।
যায়, বিশেষ করে নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরাসরি ডেভেলপারের সাথে যোগাযোগ করাই সহজ। রিসেল বাজারে এজেন্টের সাহায্য নিলে সময় বাঁচে।
জমির মালিকানা ভূমি তথ্য সেবা পোর্টালে, ভবনের অনুমোদন RAJUK এর মাধ্যমে, আর ডেভেলপারের নিবন্ধন REHAB এর ওয়েবসাইটে যাচাই করা যায়।
এমন হলে সরাসরি মালিক বা ডেভেলপারের সাথে যোগাযোগ করে দামটা নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।