উত্তরার পুরনো সেক্টরগুলোতে জায়গা প্রায় শেষ। দাম গেছে বেড়ে। তাই অনেক ক্রেতাই এখন চোখ রাখছেন সেক্টর ১৫, ১৬, ১৭ আর ১৮-এর দিকে, যেখানে দাম তুলনামূলক কম, কিন্তু তথ্যের অভাবও প্রকট।
সমস্যাটা এখানেই। কোন সেক্টরে আসলে বসবাসযোগ্য অবকাঠামো তৈরি হয়ে গেছে, আর কোনটা এখনো কাগজে-কলমে প্ল্যান পর্যায়ে, সেটা স্পষ্ট করে বলার মতো কনটেন্ট কার্যত নেই। ভুল সেক্টর বেছে নিলে বছরের পর বছর অসম্পূর্ণ রাস্তা, বিদ্যুৎ সংযোগের ঝামেলা আর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কাটাতে হতে পারে।
এই লেখায় সেক্টরভিত্তিক বাস্তব অবস্থা, দাম আর সতর্কতাগুলো এক জায়গায় দেওয়া হলো, যাতে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সহজ হয়।
রাজউকের উত্তরা মডেল টাউন সম্প্রসারণ প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ে পড়ে সেক্টর ১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮। এই পর্যায়ে প্রায় ২,১৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, যেখানে প্রায় ১০,০০০ আবাসিক প্লট বরাদ্দের পরিকল্পনা ছিল। প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৩.১৬ বিলিয়ন টাকা।
এই সম্প্রসারণ প্রকল্পের মেয়াদ একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে, যার একটি সময়সীমা ছিল ২০২২ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ এই সেক্টরগুলো এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, বরং বিভিন্ন ব্লকে বিভিন্ন গতিতে উন্নয়ন চলছে। অনেকেই ভাবেন তৃতীয় পর্ব মানে শুধু সেক্টর ১৮, কিন্তু আসলে চারটি সেক্টরই এই পর্বের অন্তর্ভুক্ত।
চারটি সেক্টরের উন্নয়নের গতি একরকম নয়। নিচে যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতে একটা চিত্র দেওয়া হলো।
এই সেক্টরে প্লট উন্নয়নের গতি সবচেয়ে ধীর। প্রাইভেট ডেভেলপারদের কার্যক্রমও অন্য তিনটি সেক্টরের তুলনায় চোখে কম পড়ে। কম দামে প্লট খোঁজার জন্য এটা একটা বিকল্প হতে পারে, তবে সেই কম দামের পেছনে কারণটাও মনে রাখা দরকার। অবকাঠামো এখনো অনেকটাই বাকি, তাই যাওয়ার আগে রাজউক অফিসে গিয়ে নিজে খোঁজ নেওয়াই ভালো।
আবাসিক প্লট এখানে বরাদ্দ হয়ে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু রাস্তা আর ইউটিলিটি সংযোগ এগোচ্ছে ব্লক ধরে ধরে, একসাথে নয়। যে ব্লকে নির্মাণকাজ আগে শুরু হয়েছিল, সেখানে গিয়ে দেখলে পার্থক্যটা স্পষ্ট বোঝা যায়। পাশের ব্লকেই হয়তো এখনো ফাঁকা জমি।
মূল উত্তরা থেকে দূরত্বটাই এই সেক্টরের সবচেয়ে বড় নির্ধারক। যোগাযোগ ব্যবস্থা কতটা সহজ, সেটার ওপর নির্ভর করছে এখানকার বসবাসযোগ্যতা। একই সেক্টরের ভেতরেও ব্লকভেদে দাম আর সুযোগ-সুবিধায় ফারাক আছে, তাই শুধু সেক্টর নম্বর দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে নির্দিষ্ট ব্লক ধরে যাচাই করা দরকার।
চারটি সেক্টরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তথ্য পাওয়া যায় এই সেক্টর নিয়ে, কারণ এখানে রাজউকের নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প আছে। ১৬ তলাবিশিষ্ট ৭৯টি ভবনে প্রায় ৬,৬৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মিত বা নির্মাণাধীন, প্রতিটির গ্রস আয়তন প্রায় ১,৬৫৪ বর্গফুট, যার মধ্যে নীট প্রায় ১,২৭৬ বর্গফুট আর বাকিটা কমন স্পেস।
সেক্টরটি পড়েছে এয়ারপোর্টের পেছনের দিকে, আশুলিয়া বেড়িবাঁধ ঘেঁষে। পরিকল্পনায় প্রশস্ত রাস্তা, স্কুল, শিশুদের খেলার মাঠ, শপিং কমপ্লেক্স, সবই আছে। বাস্তবে কতটুকু হয়েছে, সেটা ব্লক অনুযায়ী আলাদা হবেই।
| সেক্টর | উন্নয়নের ধাপ | মূল সুবিধা | সতর্কতা |
|---|---|---|---|
| সেক্টর ১৫ | প্রাথমিক পর্যায়ে | তুলনামূলক কম দামে প্লট | অবকাঠামো এখনো অসম্পূর্ণ |
| সেক্টর ১৬ | মাঝারি পর্যায়ে | কিছু ব্লকে নির্মাণকাজ এগিয়েছে | ইউটিলিটি সংযোগ ব্লকভেদে ভিন্ন |
| সেক্টর ১৭ | মাঝারি পর্যায়ে | তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ | মূল উত্তরা থেকে দূরত্ব বেশি |
| সেক্টর ১৮ | সবচেয়ে অগ্রসর | রাজউকের নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প, স্কুল-মাঠ পরিকল্পনা | এয়ারপোর্ট সংলগ্ন হওয়ায় শব্দের বিষয় বিবেচনায় রাখুন |
উত্তরার প্রতিষ্ঠিত সেক্টরগুলোতে বর্গফুট প্রতি দাম সাধারণত ৬,০০০ থেকে ১১,০০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। ডায়াবাড়ির মতো তুলনামূলক নতুন এলাকাগুলোও এই রেঞ্জের কাছাকাছি রয়েছে, এবং আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে পুরোপুরি উন্নত হলে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা আছে।
সেক্টর ১৫-১৮ যেহেতু এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, তাই এখানে দাম সাধারণত প্রতিষ্ঠিত সেক্টরের চেয়ে কম থাকে। এয়ারপোর্ট সম্প্রসারণ এবং নতুন এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প এলাকার মূল্য ভবিষ্যতে আরও বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হয়, তবে এই সেক্টরগুলোর নির্দিষ্ট মূল্য নির্ভর করে কোন ব্লকে অবকাঠামো কতটা এগিয়েছে তার ওপর। তাই কেনার আগে হালনাগাদ দাম সরাসরি স্থানীয় ডেভেলপার বা রাজউক অফিস থেকে যাচাই করে নেওয়া ভালো।
এই সেক্টরগুলো নিয়ে যেসব প্রতিবেদন পাওয়া যায়, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপত্তা। মেট্রোরেল চালুর পর এই এলাকায় জনবসতি ও বহুতল ভবন দ্রুত বেড়েছে, দোকানপাট ও রেস্টুরেন্টও গড়ে উঠেছে। কিন্তু উন্নয়নের গতির সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাল মিলিয়ে বাড়েনি বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ আছে। চুরি-ছিনতাই এবং সড়কবাতির অভাবের কথা সেক্টর ১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮-এর বাসিন্দারা তুলে ধরেছেন।
এটা এড়িয়ে যাওয়ার মতো বিষয় নয়। যারা এই সেক্টরগুলোতে ফ্ল্যাট কেনার কথা ভাবছেন, তাদের উচিত এলাকা ভ্রমণ করে সন্ধ্যার পর রাস্তার আলো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিজে দেখে আসা, শুধু বিজ্ঞাপনের ছবির ওপর নির্ভর না করা।
উত্তরার পুরনো সেক্টর, যেমন সেক্টর ৪, ৭ বা ১০, ইতিমধ্যে স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ও গণপরিবহনের দিক থেকে অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত। এসব এলাকায় দৈনন্দিন জীবনযাপন সহজ, তবে দাম তুলনামূলক বেশি এবং নতুন প্লট পাওয়া কঠিন।
সেক্টর ১৫-১৮ এই তুলনায় অনেকটাই বিপরীত। দাম কম, জায়গার সুযোগ বেশি, কিন্তু দৈনন্দিন সুযোগ-সুবিধা এখনো গড়ে ওঠার পথে। যারা তাৎক্ষণিক বসবাসের জন্য ফ্ল্যাট খুঁজছেন, তাদের জন্য পুরনো সেক্টর ভালো বিকল্প। আর যারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কথা ভাবছেন এবং কয়েক বছর অপেক্ষা করতে রাজি আছেন, তাদের জন্য এই নতুন সেক্টরগুলো বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।
রাজউক উত্তরা তৃতীয় পর্ব বলতে কি শুধু সেক্টর ১৮ বোঝায়? না। তৃতীয় পর্যায়ের আওতায় সেক্টর ১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮, এই চারটি সেক্টরই পড়ে। সেক্টর ১৮-তে রাজউকের নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প থাকায় এটি নিয়ে বেশি আলোচনা হয়, তবে বাকি তিনটি সেক্টরও একই পর্বের অংশ।
সেক্টর ১৮-এ ফ্ল্যাটের আয়তন কত? রাজউকের অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে ফ্ল্যাটের গ্রস আয়তন প্রায় ১,৬৫৪ বর্গফুট, যার মধ্যে নীট আয়তন প্রায় ১,২৭৬ বর্গফুট এবং বাকিটা কমন স্পেস হিসেবে ধরা হয়।
এই সেক্টরগুলোতে স্কুল-হাসপাতাল সুবিধা আছে কি? পরিকল্পনায় স্কুল ও খেলার মাঠের মতো সুবিধা রাখা হয়েছে, বিশেষত সেক্টর ১৮-তে। তবে বাস্তবায়নের মাত্রা ব্লকভেদে ভিন্ন, তাই নির্দিষ্ট এলাকার সুযোগ-সুবিধা সরেজমিনে যাচাই করাই ভালো।
বিনিয়োগের জন্য কোন সেক্টর সবচেয়ে ভালো? এককথায় উত্তর দেওয়া কঠিন। সেক্টর ১৮ তুলনামূলক এগিয়ে থাকায় স্বল্পমেয়াদি স্বস্তির দিক থেকে ভালো হতে পারে, আবার সেক্টর ১৫ বা ১৬-এ কম দামে প্লট পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাজেট, সময়সীমা এবং ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা বিবেচনায় রাখা উচিত।
উত্তরায় প্রতিষ্ঠিত সেক্টরে ফ্ল্যাট খুঁজছেন? সেক্টর ৭ বনাম সেক্টর ১০ এবং সেক্টর ৪-এর তুলনামূলক গাইড দেখে নিতে পারেন।