ফ্ল্যাটের রিসেল ভ্যালু কীভাবে বাড়াবেন

ফ্ল্যাটের রিসেল ভ্যালু কীভাবে বাড়াবেন: ২০২৬ সালে ঢাকার বাজারে যা জানা জরুরি

সম্প্রতি আমাদের একজন দীর্ঘদিনের ক্লায়েন্ট যোগাযোগ করেন। বসুন্ধরায় তার একটি ফ্ল্যাট ছিল, সাত বছর আগে কেনা। পারিবারিক প্রয়োজন বৃদ্ধির কারণে তিনি বড় পরিসরের ফ্ল্যাটে স্থানান্তরিত হতে চাইছিলেন এবং পুরনো ফ্ল্যাটটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। প্রথম ক্রেতার কাছ থেকে যে প্রস্তাব আসে, তা প্রত্যাশার তুলনায় যথেষ্ট কম ছিল। যে দামে ফ্ল্যাটটি কেনা হয়েছিল, তার চেয়ে সামান্য বেশি দামই কেবল প্রস্তাব করা হচ্ছিল, যদিও গত সাত বছরে ঢাকার জমির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

কারণ অনুসন্ধান করতে বেশি সময় লাগেনি। ফ্ল্যাটের মিউটেশন হালনাগাদ করা ছিল না, হোল্ডিং ট্যাক্সের কয়েক বছরের রশিদ সংরক্ষিত ছিল না, এবং ভবনের লিফট দুই বছর ধরে অনিয়মিতভাবে বিকল থাকলেও তা মেরামতের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। এই তিনটি বিষয় মিলিয়ে ক্রেতার মনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, আর সেই অনিশ্চয়তার মূল্য শেষ পর্যন্ত বিক্রেতাকেই লাখ টাকার অঙ্কে বহন করতে হয়।

রিসেল ভ্যালু নিয়ে আলোচনা সাধারণত বিক্রির সময় শুরু হয়। বাস্তবে এর ভিত্তি তৈরি হয় ফ্ল্যাট কেনার দিন থেকেই।

এখন কেন এই আলোচনা জরুরি

গত কয়েক মাসে আবাসন খাতে যা হয়েছে, তা নিয়ে কথা না বললেই নয়। নতুন বাজেটে নির্মাণ সামগ্রীর ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব, জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর অতিরিক্ত কর, এসব মিলিয়ে অনেক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের ফ্ল্যাট বিক্রি রীতিমতো কমে গেছে বলে REHAB এর নেতারা সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন। কিছু বড় প্রতিষ্ঠান তো সরাসরি বলছে বিক্রি প্রায় পঞ্চমাংশ কমেছে।

বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে, এটা স্পষ্ট। ক্রেতারাও আগের চেয়ে সতর্ক। যে ফ্ল্যাটের কাগজপত্র পরিষ্কার না বা রক্ষণাবেক্ষণ ভালো না, সেটা বিক্রি করা এখন কঠিন। যে ফ্ল্যাট সব দিক দিয়ে ঠিকঠাক, তার জন্য ক্রেতারা এখনও লাইন দিচ্ছেন।

আমার মনে হয়, এই সময়টা বরং সুযোগ। যারা এখন থেকে ফ্ল্যাটের রিসেল ভ্যালু নিয়ে সচেতন হবেন, বাজার যখন আবার চাঙা হবে, তারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন।

লোকেশনের হিসাব এখনও বদলায়নি

উত্তরা, বসুন্ধরা কিংবা ধানমন্ডির মতো এলাকায় ফ্ল্যাটের দাম সবসময় স্থিতিশীল থাকে, কারণ এসব জায়গায় স্কুল, হাসপাতাল, বাজার সবকিছু হাতের নাগালে। মেট্রোরেলের রুট যেসব এলাকায় গেছে বা যাচ্ছে, সেখানকার ফ্ল্যাটের রিসেল ভ্যালু গত তিন-চার বছরে সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে বলেই আমরা দেখেছি। উত্তরা ও দিয়াবাড়ির প্রবণতা এর ভালো উদাহরণ। এই এলাকাগুলো নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ পাবেন ঢাকায় সাশ্রয়ী ফ্ল্যাট কেনার এলাকা নিয়ে আমাদের গাইডে

শুধু বর্তমান লোকেশন না, ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও দেখতে হবে। পূর্বাচল বা কেরানীগঞ্জের মতো এলাকায় এখন দাম তুলনামূলক কম, কিন্তু নতুন রাস্তা আর এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কারণে আগামী পাঁচ-সাত বছরে এসব এলাকার রিসেল ভ্যালু দ্রুত বাড়তে পারে। যারা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ ভাবছেন, তাদের এই দিকটা মাথায় রাখা উচিত।

কাগজপত্রেই আটকে যান বেশিরভাগ বিক্রেতা

সত্যি বলতে, আমাদের কাছে যত বিক্রেতা আসেন, তাদের একটা বড় অংশ এই জায়গাতেই সমস্যায় পড়েন। মিউটেশন করা নেই, হোল্ডিং ট্যাক্স বাকি পড়ে আছে, কিংবা RAJUK এর অনুমোদনের কাগজ কোথায় আছে সেটাই মনে নেই।

ক্রেতা যখন একটা ফ্ল্যাট দেখতে আসেন, তিনি শুধু দেয়াল আর জানালা দেখেন না। তিনি জানতে চান জমির মূল দলিল ঠিক আছে কিনা, মিউটেশন আপডেট কিনা, RAJUK অনুমোদিত বিল্ডিং কিনা। এই কাগজগুলো যদি গুছানো না থাকে, দরদাম শুরুর আগেই ক্রেতা পিছিয়ে যান, অথবা দাম কমিয়ে দেন এই ঝুঁকির অজুহাতে। RAJUK এর ওয়েবসাইটে অনুমোদনের অবস্থা যাচাই করার সুযোগ আছে। বিক্রির আগে এটা একবার নিজেই যাচাই করে নেওয়া ভালো।

মিউটেশন থেকে রেজিস্ট্রেশন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা আছে আমাদের জমি বিক্রয়ের কাগজপত্র নিয়ে লেখা গাইডে। ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য, শুধু জমির বদলে ফ্ল্যাটের মালিকানা দলিল।

রক্ষণাবেক্ষণ অবহেলা করবেন না

এই অংশটা নিয়ে আমার একটা ব্যক্তিগত মত আছে, হয়তো সবাই একমত হবেন না। আমার মনে হয় বাংলাদেশে মানুষ ফ্ল্যাটের বাইরের সৌন্দর্যে যতটা টাকা খরচ করে, ভেতরের সিস্টেমে ততটা করে না। অথচ ক্রেতা যখন ফ্ল্যাট দেখতে আসেন, তিনি প্রথমে খেয়াল করেন পানির লাইনে চাপ ঠিক আছে কিনা, ইলেকট্রিক ওয়্যারিং পুরনো কিনা, বাথরুমের টাইলসে ফাটল আছে কিনা।

লিফট, জেনারেটর আর পানির পাম্প ঠিকঠাক চলছে কিনা সেটাও বড় ব্যাপার, বিশেষ করে বহুতল ভবনে। বিল্ডিংয়ের কমন এরিয়া অগোছালো থাকলে বা সিঁড়িতে ধুলা জমে থাকলে সেটাও ক্রেতার মনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে, যদিও এর সাথে আপনার নিজের ফ্ল্যাটের কোনো সম্পর্ক নেই। তবু মানুষ এভাবেই বিচার করে।

বিক্রির ছয় মাস আগে থেকে ছোটখাটো মেরামত সেরে ফেলা যায়। রং করা, টাইলস ঠিক করা, দরজা-জানালার কব্জা ঠিক করা। খরচ কম, রিটার্ন অনেক বেশি। আমরা নিজেরা যেসব প্রজেক্টে কাজ করি, সেখানে হ্যান্ডওভারের আগেই এই ধরনের চেকলিস্ট মিলিয়ে দেখি, কারণ পরে মালিকদের এতে সুবিধা হয়।

ডেভেলপারের নাম কেন মাথায় রাখা দরকার

এটা একটু কঠিন সত্য। আপনার ফ্ল্যাটের ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান যদি সময়মতো কাজ শেষ করে, ভালো মান বজায় রাখে, বছরের পর বছর বাজারে টিকে থাকে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের নাম আপনার ফ্ল্যাটের রিসেল ভ্যালুতেও প্রভাব ফেলে। ক্রেতারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি খোঁজখবর নেন, গুগলে সার্চ করেন, আগের প্রজেক্টগুলো দেখেন।

তাই ফ্ল্যাট কেনার সময়েই এই বিষয়টা বিবেচনায় রাখা উচিত, শুধু বিক্রির সময় না। নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান চেনার ধাপগুলো বিস্তারিত পাবেন আমাদের এই লেখায়, যেখানে REHAB সদস্যপদ, RAJUK নিবন্ধন এবং আগের প্রজেক্ট যাচাইয়ের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করা আছে।

বিক্রির সময়টাও একটা সিদ্ধান্ত

আমরা প্রায়ই দেখি মানুষ তাড়াহুড়া করে ফ্ল্যাট বিক্রি করতে চান, বিশেষ করে হঠাৎ টাকার প্রয়োজন হলে। কিন্তু বাজার পরিস্থিতি বুঝে বিক্রির সময় ঠিক করাও একটা দক্ষতা। রোজার মাস আর বছরের শেষের দিকে সাধারণত ক্রেতার সংখ্যা কমে যায়, কারণ মানুষ তখন অন্য খরচের চাপে থাকে। বছরের প্রথম কয়েক মাস এবং ঈদের পরের সময়টায় উল্টো চিত্র দেখা যায়, বিশেষ করে যারা বোনাস বা ঈদ বোনাস হাতে পান তাদের আগ্রহ তখন বেশি থাকে।

সুদের হার কমলে ব্যাংক লোন পাওয়া সহজ হয়, আর তখন ক্রেতার সংখ্যাও বাড়ে। এই সময়টায় বিক্রি করলে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। লোন প্রক্রিয়া সহজ করার কৌশল নিয়ে আমাদের এই লেখাটা ক্রেতাদের সাথে দরদামের সময় কাজে লাগতে পারে।

বিক্রির আগে যা যা মিলিয়ে দেখবেন

নিচের তালিকাটা আমরা নিজেরাই ব্যবহার করি ক্লায়েন্টদের সাথে বসে ফ্ল্যাট বিক্রির প্রস্তুতি নেওয়ার সময়। খুব জটিল কিছু না, কিন্তু প্রায়ই মানুষ এই সহজ কাজগুলো বাদ দিয়ে ফেলে।

  • মিউটেশন সার্টিফিকেট হালনাগাদ আছে কিনা দেখে নিন
  • হোল্ডিং ট্যাক্স ও সার্ভিস চার্জের রশিদ একসাথে গুছিয়ে রাখুন
  • RAJUK অনুমোদনের কপি হাতের কাছে রাখুন
  • চোখে পড়ার মতো ছোটখাটো মেরামতগুলো আগে সেরে ফেলুন
  • লিফট, জেনারেটর, পানির লাইন ঠিকঠাক আছে কিনা নিশ্চিত করুন
  • আশেপাশের একই ধরনের ফ্ল্যাটের সাম্প্রতিক বিক্রির দাম খোঁজ নিয়ে বাজার দর যাচাই করুন

এই কাজগুলো একসাথে করতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। কিন্তু ফল অনেক বছর ধরে ভোগ করা যায়। শুরুতে যে ক্লায়েন্টের কথা বলেছিলাম, কাগজপত্র ঠিক করে ও ছোটখাটো মেরামত সেরে তিন মাস পর যখন তিনি আবার ফ্ল্যাটটা বাজারে তোলেন, প্রথম দফায় যে দাম প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তার চেয়ে প্রায় বারো শতাংশ বেশি দামে ফ্ল্যাটটা বিক্রি হয়।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

প্রশ্ন ১: ফ্ল্যাটের রিসেল ভ্যালু বাড়াতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে কোনটা?

আমাদের অভিজ্ঞতায়, কাগজপত্রের স্বচ্ছতা আর লোকেশন, এই দুটোই সবচেয়ে বড় প্রভাবক। ভালো লোকেশনের ফ্ল্যাটও কাগজপত্রে সমস্যা থাকলে দাম কমে যায়।

প্রশ্ন ২: নতুন করের প্রভাবে কি এখন ফ্ল্যাট বিক্রি করা ঠিক হবে?

নির্ভর করে ফ্ল্যাটের অবস্থার ওপর। কাগজপত্র ও রক্ষণাবেক্ষণ ভালো থাকলে এই বাজারেও ভালো দাম পাওয়া সম্ভব, কারণ ভালো ফ্ল্যাটের সংখ্যা বাজারে তুলনামূলক কম।

প্রশ্ন ৩: রিসেল ফ্ল্যাটে ব্যাংক লোন পাওয়া যায় কি?

হ্যাঁ, তবে RAJUK অনুমোদন আর মিউটেশন ঠিক থাকতে হবে। ব্যাংক এই কাগজপত্র যাচাই করেই লোন অনুমোদন করে।

প্রশ্ন ৪: ছোটখাটো মেরামতে কত খরচ হতে পারে?

ফ্ল্যাটের আকার ও অবস্থাভেদে কয়েক হাজার থেকে এক-দুই লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, তবে এই খরচ সাধারণত বাড়তি বিক্রয়মূল্যে পুষিয়ে যায়।

প্রশ্ন ৫: এজেন্ট ছাড়া নিজে ফ্ল্যাট বিক্রি করা যায় কি?

যায়। তবে অভিজ্ঞ কারো সাহায্য নিলে সঠিক দাম নির্ধারণ আর ক্রেতা খুঁজে পাওয়া, দুটোই সহজ হয়।

রিসেল ভ্যালু আসলে অনেকগুলো ছোট সিদ্ধান্তের যোগফল, যেগুলো ফ্ল্যাট কেনার দিন থেকেই শুরু হয়। বাজার পরিস্থিতি বদলাতে থাকবে, কর নীতি বদলাবে, সুদের হার ওঠানামা করবে। কিন্তু কাগজপত্র পরিষ্কার রাখা আর ফ্ল্যাটের যত্ন নেওয়া, এই দুটো সবসময় আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে। আপনার ফ্ল্যাটের কাগজপত্র বা বিক্রির পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে চাইলে GLG Assets এর সাথে যোগাযোগ করতে পারেন, আমরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাশে থাকি।