ফ্ল্যাট কেনার আগে পার্কিং স্পেস নিয়ে কী কী যাচাই করবেন?

হ্যান্ডওভারের দিন গাড়ি নিয়ে বেসমেন্টে নামলেন, দেখলেন যে জায়গাটা দেখিয়ে ফ্ল্যাট বিক্রি করা হয়েছিল সেখানে অন্য কারও গাড়ি দাঁড়ানো। দলিল খুলে দেখলেন পার্কিংয়ের কথা লেখাই নেই। রেজিস্ট্রেশন শেষ, টাকা শোধ, এখন আলোচনার জায়গাটাও নেই। ফ্ল্যাট কেনার আগে পার্কিং স্পেস যাচাই করা মানে কেবল “গ্যারেজ আছে কি না” জিজ্ঞেস করা নয়। নিচের ধাপগুলো বুকিং মানি দেওয়ার আগেই সেরে ফেলুন।

পার্কিং কি দামের মধ্যে ধরা, নাকি আলাদা কিনতে হবে?

প্রথম প্রশ্নটাই এটা, এবং উত্তরটা মুখে নয়, লিখিতভাবে নিন। বাংলাদেশে অনেক প্রকল্পে ফ্ল্যাটের দাম আর কার পার্কিংয়ের দাম আলাদা ধরা হয়, ক্রেতা সেটা বুঝতে পারেন বায়নানামা সই করার সময়। কোয়ার্টার পেজের প্রাইস শিটে “প্রতি বর্গফুট এত টাকা” লেখা থাকে, পার্কিং সেখানে থাকে না।

আলাদা হলে তিনটা জিনিস জেনে নিন: দাম কত, কিস্তিতে দেওয়া যাবে কি না, আর রেজিস্ট্রেশন খরচ এর ওপর আলাদা করে বসবে কি না। দাম এলাকা, প্রকল্পের ধরন আর স্টল কভার্ড না ওপেন তার ওপর নির্ভর করে বেশ খানিকটা ওঠানামা করে, তাই পাশের ভবনের দাম শুনে হিসাব করবেন না।

উত্তরার বাজারে দাম আর সেক্টরভেদে পার্থক্য কেমন, সেটা নিয়ে আলাদা আলোচনা আছে উত্তরায় ফ্ল্যাট কেনার পূর্ণাঙ্গ গাইডে। আর GLG Assets-এর চলমান প্রকল্পগুলোতে পার্কিং কীভাবে বরাদ্দ হয়, সেটা দেখে নিতে পারেন আমাদের প্রজেক্ট পেজে [প্রজেক্ট পেজের URL বসাতে হবে]।

দলিল ও চুক্তিতে পার্কিং কীভাবে লেখা থাকা উচিত

এখানেই সবচেয়ে বেশি ক্রেতা ঠকেন। ব্রোশিওরে পার্কিংয়ের ছবি থাকে, সেলস এক্সিকিউটিভ বেসমেন্টে নিয়ে গিয়ে জায়গা দেখান, কিন্তু কাগজে সেটার কোনো চিহ্ন থাকে না।

বায়নানামা ও সাফ-কবলায় যা থাকতেই হবে

চারটা জিনিস। স্লট নম্বর, স্লটের মাপ, অবস্থান (বেসমেন্ট না গ্রাউন্ড ফ্লোর, ভবনের কোন পাশে), আর অনুমোদিত নকশার কোন স্টলটা এটা। শুধু “একটি কার পার্কিংসহ” লেখা থাকলে সেটা অনেকটা ফাঁকা প্রতিশ্রুতি, কারণ কোন জায়গাটা আপনার তা কাগজ থেকে বোঝার উপায় নেই।

নম্বর উল্লেখ না থাকলে যে সমস্যাটা হয়

ভবনের মালিক সমিতি গঠনের পর স্লট নিয়ে ভাগাভাগি শুরু হয়। যাঁর দলিলে নির্দিষ্ট স্লট নম্বর লেখা, তাঁর দাবি শক্ত। যাঁর দলিলে শুধু “পার্কিংসহ” লেখা, তাঁকে প্রতিবছর নতুন করে দরকষাকষি করতে হয়। লিফটের পাশের সুবিধাজনক স্লট আর র‍্যাম্পের মুখের অসুবিধাজনক স্লটের মধ্যে পার্থক্যটা তখনই টের পাওয়া যায়।

কোন কোন কাগজ কেনার আগে দেখে নিতে হয়, তার পূর্ণ তালিকা আছে ফ্ল্যাট কেনার নিয়ম কানুন নিয়ে লেখাটিতে। আর হস্তান্তরের পর নামজারির ধাপে পার্কিংসহ সম্পত্তির বিবরণ কীভাবে যায়, সেটা দেখুন ফ্ল্যাট নামজারি করতে কী কী লাগে লেখায়।

রাজউক অনুমোদিত নকশা হাতে নিয়ে বেসমেন্টে নামুন

ডেভেলপারের কাছে অনুমোদিত নকশার কপি চান। এটা চাওয়া আপনার অধিকার, আর যে প্রতিষ্ঠান দিতে গড়িমসি করে সেটাই প্রথম সতর্কবার্তা। নকশায় পার্কিং লেআউট আঁকা থাকে, প্রতিটা স্টল নম্বর করা থাকে।

এবার নকশা হাতে নিয়ে বাস্তবে স্টল গুনুন। মিলছে কি না দেখুন।

পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান বা স্টোররুম থাকলে

রাজধানীর অধিকাংশ আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে পার্কিংয়ের জায়গায় অবৈধভাবে দোকান ও ফ্ল্যাট তৈরি করা হয়েছে, এবং রাজউক মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালালেও পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয়নি। এর ঝুঁকিটা পুরোপুরি ক্রেতার ঘাড়ে পড়ে। উচ্ছেদ হলে জায়গাটা খালি হয় ঠিকই, কিন্তু ততদিনে আপনি টাকা দিয়ে ফেলেছেন এমন একটা স্টলের বিপরীতে, যেটা নকশায় কখনো ছিলই না। Samakal

নির্মাণাধীন প্রকল্পে এই ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ সেখানে আপনি কাগজ দেখে কিনছেন। রেডি আর নির্মাণাধীনের পার্থক্যগুলো আলাদা করে দেখা আছে রেডি ফ্ল্যাট বনাম নির্মাণাধীন ফ্ল্যাট লেখায়। রাজউকের অনুমোদন ও বরাদ্দ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া বুঝতে কাজে লাগবে রাজউকের প্লট ও ফ্ল্যাট ক্রয়ের নিয়ম।

ইউনিট বনাম স্টল: হিসাবটা নিজে করুন

ভবনে ফ্ল্যাট কয়টা, পার্কিং স্টল কয়টা। এই দুটো সংখ্যা পাশাপাশি রাখলেই অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়।

যা দেখবেন কোথা থেকে কী বোঝা যায়
মোট ইউনিট সংখ্যা ব্রোশিওর ও নকশা চাহিদা কত
নকশায় স্টল সংখ্যা অনুমোদিত নকশা সরবরাহ কত
বাস্তবে গোনা স্টল সরেজমিনে নকশা মানা হয়েছে কি না
ভিজিটর স্লট নকশা ও সমিতির নিয়ম অতিথির গাড়ি কোথায় দাঁড়াবে
প্রতি ফ্ল্যাটে বরাদ্দ চুক্তি দ্বিতীয় গাড়ির সুযোগ আছে কি না

স্টল যদি ইউনিটের চেয়ে কম হয়, ধরে নিন ভবিষ্যতে মালিকদের মধ্যে টানাপোড়েন হবে। স্টল যদি বেশি হয়, দ্বিতীয় গাড়ি বা ভাড়া দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে, সেটাও চুক্তিতে স্পষ্ট করে নিন।

বড় পরিবারের ক্ষেত্রে দুটো গাড়ির প্রশ্ন আগেই আসে। কত বড় ফ্ল্যাট আপনার দরকার সেই হিসাবটা করে নিতে পারেন পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী ফ্ল্যাটের সাইজ লেখা থেকে।

সরেজমিনে সাতটা জিনিস মেপে দেখুন

ফিতা নিয়ে যান। সেলস টিম অবাক হবে, কিন্তু আপনার টাকা।

র‍্যাম্পের ঢাল ও প্রস্থ। খুব খাড়া র‍্যাম্পে নিচু গাড়ির বাম্পার ঘষা খায়, বর্ষায় চাকা স্লিপ করে। র‍্যাম্পে দাঁড়িয়ে দেখুন উপর থেকে নামা আর নিচ থেকে ওঠা গাড়ি একসঙ্গে পড়লে কী হয়।

ছাদের ক্লিয়ার উচ্চতা। মাপতে হবে বিম আর ঝুলে থাকা পাইপের নিচ পর্যন্ত, স্ল্যাব পর্যন্ত নয়। বিল্ডিং কোডে আবাসিক ভবনের প্রাইভেট গ্যারেজের জন্য ন্যূনতম ক্লিয়ার উচ্চতা ২.০৩ মিটার নির্ধারিত আছে, আর পার্কিং স্টলের ন্যূনতম আয়তন ২৩ বর্গমিটারের কম হতে পারবে না। [সংখ্যাগুলো BNBC 2012-এর অংশ থেকে নেওয়া। প্রকাশের আগে BNBC 2020 Part 3 থেকে মিলিয়ে নিতে হবে] Law.Resource.Org

পিলার থেকে পিলার দূরত্ব। গাড়ি ঢোকানো এক জিনিস, দরজা খুলে নামা আরেক। দুই পাশে অন্তত একজন মানুষ পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মতো জায়গা আছে কি না দেখুন।

গাড়ি ঘোরানোর জায়গা। আপনার স্লট থেকে গাড়ি বের করতে অন্য কয়টা গাড়ি সরাতে হয়, এই একটা প্রশ্নের উত্তরেই অনেক প্রকল্প বাদ পড়ে যায়।

পানি নিষ্কাশন। বর্ষার সময় বেসমেন্টে পানি জমে কি না, পাম্প আছে কি না, পাম্প বিদ্যুৎ গেলে চলে কি না। পুরোনো ভবন হলে আশপাশের ফ্ল্যাট মালিকদের জিজ্ঞেস করলেই সত্যি কথাটা পাবেন।

আলো ও বাতাস। বেসমেন্টে ভেন্টিলেশন দুর্বল হলে ধোঁয়া জমে, আর অন্ধকার কোণা নিরাপত্তার ঝুঁকি।

সিসিটিভি ও নিরাপত্তা। ক্যামেরা কয়টা, রেকর্ডিং কতদিন থাকে, রাতে গার্ড থাকে কি না।

উত্তরায় ফ্ল্যাট খুঁজছেন এবং এই যাচাইগুলো একসঙ্গে সেরে ফেলতে চাইলে আমাদের উত্তরা সার্ভিস এরিয়া পেজ দেখতে পারেন।

ভিজিটর পার্কিং, মোটরসাইকেল আর ড্রাইভারের জায়গা

আত্মীয় এলে গাড়ি কোথায় দাঁড়াবে, এই প্রশ্নটা কেনার সময় কারও মাথায় আসে না, ওঠার পর প্রতি সপ্তাহে আসে। নকশায় ভিজিটর স্লট আছে কি না দেখুন, আর সমিতির নিয়মে সেটা কীভাবে ব্যবহার হয় জিজ্ঞেস করুন।

মোটরসাইকেলের জায়গা আলাদা করা আছে নাকি গাড়ির স্লটের ফাঁকে গুঁজে দেওয়া হয়, সেটাও দেখার বিষয়। ড্রাইভারের বসার জায়গা ও টয়লেট থাকলে বেসমেন্টের পরিবেশ অন্যরকম থাকে।

সার্ভিস চার্জে পার্কিং বাবদ কী ধরা আছে

মাসিক সার্ভিস চার্জের ভাঙানো হিসাব চান। বেসমেন্টের আলো, পানির পাম্প, শাটার মেইনটেন্যান্স, গার্ড, ক্যামেরা, এগুলো সাধারণত সার্ভিস চার্জের ভেতরে থাকে।

যা আলাদা হতে পারে: গাড়ি ধোয়ার পানি, ইভি চার্জিংয়ের বিদ্যুৎ, দ্বিতীয় স্লটের জন্য বাড়তি চার্জ। পার্কিং না থাকলে সার্ভিস চার্জ কম হবে কি না, এই প্রশ্নটাও করে রাখুন, কারণ অনেক ভবনে হয় না।

ইভি চার্জিং: এখন দরকার নেই, পাঁচ বছর পরে হবে

ফ্ল্যাট কিনছেন পনেরো বিশ বছরের জন্য। বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা এখনো কম, তবে দেশে বাণিজ্যিক চার্জিং স্টেশন বসতে শুরু করেছে এবং সরকারি সুবিধা ও বেসরকারি বিনিয়োগের পর খাতটি দ্রুত বড় হওয়ার পথে আছে। thedailystartbsnews

চারটা প্রশ্ন এখনই করে রাখুন। স্লটের কাছে ডেডিকেটেড আউটলেট আছে কি না। ভবনের লোড ক্যাপাসিটিতে চার্জার যোগ করার জায়গা আছে কি না। মিটার আলাদা বসবে নাকি কমন বিলে যাবে। পরে বসাতে চাইলে মালিক সমিতির লিখিত অনুমতি লাগবে কি না।

উত্তরটা “পরে দেখা যাবে” হলে সমস্যা নেই, কিন্তু উত্তরটা চুক্তিতে থাকলে পরে তর্ক হয় না।

রিসেলের সময় পার্কিং কতটা কাজে লাগে

দলিলে নির্দিষ্ট স্লট নম্বরসহ পার্কিং থাকা ফ্ল্যাট বিক্রি করা সহজ, কারণ ক্রেতার আইনজীবী কাগজ দেখেই নিশ্চিত হতে পারেন। উল্টো দিকে “পার্কিং আছে কিন্তু কাগজে নেই” ধরনের ফ্ল্যাটে দরদামের সময় ক্রেতা সেই অনিশ্চয়তার দাম কেটে নেন।

পার্কিং আলাদা করে বিক্রি বা ভাড়া দেওয়ার প্রশ্নে ভবনভেদে নিয়ম ভিন্ন, তাই সমিতির গঠনতন্ত্রে এ বিষয়ে কী আছে দেখে নিন। পুরোনো ফ্ল্যাট বিক্রির অন্য দিকগুলো নিয়ে আলোচনা আছে পুরাতন ফ্ল্যাট দ্রুত বিক্রির উপায় লেখায়।

বুকিংয়ের আগে এই ১২টা প্রশ্ন করুন

যাচাইয়ের বিষয় কোথায় দেখবেন না মিললে করণীয়
পার্কিং দামের মধ্যে কি না প্রাইস শিট, বায়নানামা লিখিত নিশ্চয়তা চান
স্লট নম্বর ও অবস্থান চুক্তি ও দলিলের খসড়া সংশোধন করিয়ে নিন
অনুমোদিত নকশার কপি ডেভেলপার না দিলে এগোবেন না
নকশা বনাম বাস্তব স্টল সরেজমিনে গুনে পার্থক্যের কারণ জানুন
ইউনিট বনাম স্টল সংখ্যা নকশা কম হলে বরাদ্দ নীতি দেখুন
স্টলের মাপ ও উচ্চতা ফিতা দিয়ে গাড়ির মাপ ধরে মেলান
র‍্যাম্পের ঢাল সরেজমিনে গাড়ি নিয়ে উঠে দেখুন
জল জমে কি না প্রতিবেশীদের জিজ্ঞেস পাম্প ব্যবস্থা দেখুন
ভিজিটর স্লট নকশা ও সমিতির নিয়ম না থাকলে জেনে রাখুন
সার্ভিস চার্জের ভাঙানো হিসাব সমিতি বা ডেভেলপার লিখিত নিন
ইভি চার্জিং সম্ভাবনা ইলেকট্রিক লেআউট অনুমতির শর্ত জানুন
রিসেল ও ভাড়ার নিয়ম সমিতির গঠনতন্ত্র আগে পড়ে নিন

সচরাচর জিজ্ঞাসা

পার্কিং কি ফ্ল্যাটের দামের মধ্যেই থাকে?
সব প্রকল্পে না। অনেক ডেভেলপার কার পার্কিং আলাদা দামে বিক্রি করেন। প্রাইস শিটে স্পষ্ট করে লেখা না থাকলে ধরে নেবেন না।

দলিলে পার্কিংয়ের কথা উল্লেখ থাকা কি জরুরি?
জরুরি। উল্লেখ না থাকলে পরবর্তীতে নির্দিষ্ট স্লটের ওপর দাবি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে মালিক সমিতি গঠনের পর।

গ্যারেজের জন্য আলাদা কত টাকা লাগে?
এলাকা, প্রকল্প আর স্টলের ধরনভেদে অনেকটা পার্থক্য হয়, তাই একক কোনো সংখ্যা ধরে হিসাব করা ঠিক হবে না। প্রকল্প ধরে দাম জেনে নিন।

ভবনে ফ্ল্যাটের চেয়ে পার্কিং কম থাকলে কী হয়?
বরাদ্দ নিয়ে মালিকদের মধ্যে বিরোধ হয়। কেনার আগে জেনে নিন বরাদ্দ কীভাবে হবে এবং আপনার স্লট চুক্তিতে নির্দিষ্ট করা আছে কি না।

পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান থাকলে ঝুঁকি কী?
সেটা নকশা বহির্ভূত নির্মাণ হতে পারে, যা উচ্ছেদের আওতায় পড়ে। ফলে আপনার প্রতিশ্রুত স্লটটাই অনিশ্চিত হয়ে যায়।

পার্কিং আলাদাভাবে ভাড়া দেওয়া যায় কি?
ভবনের গঠনতন্ত্র ও চুক্তির শর্তের ওপর নির্ভর করে। কেনার আগে লিখিত নিয়মটা দেখে নেওয়া ভালো।